ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬ , ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত পানচাষিরা: সরকারি সহযোগিতা দাবি

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৩-১১-২০২৬ ০৩:৩৮:৪৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৩-১১-২০২৬ ০৩:৩৮:৪৮ অপরাহ্ন
ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত পানচাষিরা: সরকারি সহযোগিতা দাবি ছবি : সংগৃহীত
পাহাড়ি টিলায় গাছে গাছে পানলতা আর ঘরের বারান্দায় বসে নারীদের নিপুণ হাতে পান সাজানোর দৃশ্য মৌলভীবাজারের খাসিয়া পুঞ্জিগুলোর চিরচেনা জীবনচিত্র। 

খাসিয়া পুঞ্জির বাসিন্দারা জানান, শত বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এই পান চাষই তাদের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন, কিন্তু প্রকৃতির বিরূপ আচরণ, উৎপাদন কমে যাওয়া, পানের দরপতন ও উৎপাদন খরচ বাড়ায় সেই জীবন-জীবিকায় এখন সংকট ঘনিয়েছে।
 
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও রাজনগর উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে ৬৫টি খাসিয়া পুঞ্জি। এসব পুঞ্জিতে ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে পান চাষ করা হয়। পুরুষরা পান চারার পরিচর্যা ও পাতা সংগ্রহ করেন, আর নারীরা দলবদ্ধভাবে পান সাজিয়ে তৈরি করেন বাজারজাতের উপযোগী গুছি।

খাসিয়া ভাষায় পানকে বলা হয় ‘টেম্পেউ’। ১২টি পান পাতায় এক গুছি। ১২ গুছিতে এক কান্তা এবং ২০ কান্তায় এক কুড়ি পান হয়।

চাষিদের মতে, বর্ষাকাল পানের ভরা মৌসুম হলেও চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়নি।

এতে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। আগে দেড় মাস পর পর গাছ থেকে পান সংগ্রহ করা গেলেও এখন অপেক্ষা করতে হচ্ছে দুই থেকে আড়াই মাস। 

তারা বলছেন, শুধু উৎপাদনই কমেনি, ছোট হয়ে যাচ্ছে পাতার আকারও। ফলে বাজারে বড় পানের তুলনায় কম দাম পাচ্ছেন তারা। অথচ শ্রমিকের মজুরি ও উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে।

মৌসুমভেদে প্রতিকুড়ি পান ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তার পরও বর্তমান পরিস্থিতিতে আয় দিয়ে খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সংকটের চিত্র তুলে ধরে খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের প্রচার সম্পাদক সাজু মারছিয়াং বলেন, ‘চলতি বছর মৌসুমের শুরুতে আশানুরূপ বৃষ্টি হয়। তবে জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে কম দামে পান বিক্রি করতে হয়েছে। এখন শীতের আগমনে পানের মৌসুম শেষের দিকে, অনেকের জুমে পানও কমে গেছে। ফলে খাসিয়া পুঞ্জির অনেক পরিবারকে আর্থিক সংকটে পড়তে হবে। 

সাজু মারছিয়াং আরো বলেন, ‘নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও পানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় চাষিরা হতাশ। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে খাসিয়া পান বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।’

লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মান্ত্রী ফিলা পতমী বলেন, ‘পানের রোগ-বালাইয়ের ধকল কাটিয়ে এ বছর যে উৎপাদন হয়েছে, তারও ন্যায্য মূল্য পাচ্ছি না। সবকিছুর দাম বাড়ছে, অথচ পানের দাম কমছে।’ 

তিনি বলেন,  খাসিয়াদের আয়ের প্রধান উৎস পান, কিন্তু এখন পান চাষ করতে গিয়ে অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। সরকারি আর্থিক সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পানচাষিরা ঘুরে দাঁড়াতে পারতেন।’

একই সংকটের কথা জানান কমলগঞ্জের মাধবপুর ইউনিয়নের হিরামতী খাসিয়া পুঞ্জির মান্ত্রী বিওয়ানলী সুং। তিনি বলেন, ‘আগের মতো পান বিক্রি হয় না, দামও নেই। পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। তার পরও জীবিকার তাগিদে আমাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পান চাষ চালিয়ে যাচ্ছি।’

পান শুধু খাসিয়াদের আয়ের উৎস নয়, এটি তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও অংশ। দেশের চাহিদা মিটিয়ে খাসিয়া পান বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। অথচ পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হওয়ায় সম্ভাবনাময় এ চাষাবাদে আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে দাবি তাদের।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘চাষিদের বিভিন্ন সমস্যায় কৃষি বিভাগ থেকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আরো কোনো সমস্যা থাকলে সেটিও দেখা হবে।’ 

 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ